এম এ কাদের অপু, বিভাগীয় প্রধান চট্রগ্রাম বিভাগ::
সরকারি অফিসে সাধারণ নাগরিকের প্রবেশ এবং কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়ার অধিকার আইনগতভাবে সম্পূর্ণ স্বীকৃত। কিন্তু সেবা নিতে যাওয়ার ছদ্মবেশে, সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাতারাতি ‘ভাইরাল’ হওয়ার বিকৃত মানসিকতা থেকে সরকারি দপ্তরের ভেতরে ঢুকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা, কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
সম্প্রতি কুমিল্লা জেলার বরুড়া উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে ঘটে যাওয়া এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
ঘটনাটি কেবল ওই অফিসের কর্মপরিবেশকেই মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করেনি, বরং সরকারি নিরাপত্তা ও সাইবার আইনের কার্যকারিতা নিয়েও বড় ধরনের আইনি প্রশ্ন সামনে এনেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভিডিও ধারণকারী ওই ব্যক্তি কোনো সুনির্দিষ্ট অনিয়মের প্রতিবাদ করতে নয়, বরং নিজেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইক-শেয়ারের মাধ্যমে ‘ভাইরাল’ ও হিরো হিসেবে উপস্থাপন করার হীন উদ্দেশ্যেই এই ঘটনাটি ঘটিয়েছেন।
সরেজমিনে ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন বরুড়া উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের মূল কর্মকর্তা কামরুজ্জামান রনি দাপ্তরিক একটি মিটিংয়ে অফিসের বাইরে অবস্থান করছিলেন।
কর্মকর্তার এই অনুপস্থিতির সুযোগটাই লুফে নেয় ওই ব্যক্তি। তিনি কোনো পূর্ব অনুমতি, প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় বা যৌথিক কারণ ছাড়াই অতর্কিতে নিজের মোবাইল ফোনের ক্যামেরা অন করে অফিসের ভেতরে ঢুকে পড়েন।
সেখানে উপস্থিত কর্মচারীরা বিনয়ের সাথে ভিডিও করার কারণ জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি আচমকা চরম উত্তেজিত রূপ ধারণ করেন। নিজেকে একজন বড় সমাজ-সংস্কারক হিসেবে জাহির করার উদ্দেশ্যে এবং ভিডিওতে নাটকীয়তা তৈরি করতে তিনি কর্তব্যরত কর্মচারীদের ওপর চড়াও হন।
কোনো প্রকার প্রমাণ ছাড়াই বিভিন্ন কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত আপত্তিকর, উগ্র এবং অকথ্য ভাষা ব্যবহার করতে থাকেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ওই যুবকের মূল লক্ষ্যই ছিল কর্মচারীদের উত্যক্ত করে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা, যা ফেসবুকে আপলোড করলে দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাবে। পরবর্তীতে তিনি এডিটেড ও বিভ্রান্তিকর ক্যাপশনসহ ভিডিওটি ফেসবুকে ছড়িয়ে দেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সস্তা জনপ্রিয়তার নামে সরকারি অফিসে ঢুকে আইন হাতে তুলে নেওয়ার এই সংস্কৃতি দেশের প্রচলিত আইনের পরিপন্থী। বরুড়ার এই ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি দেশের প্রধান তিনটি আইনের একাধিক গুরুতর ধারায় সরাসরি অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন।
যেসকল আইন অমান্য করে ভিডিও ধারণ ও ফেসবুকে প্রচার করেছে তার মধ্যে
১. সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ (Cyber Security Act, 2023) ২৫ ধারা অমান্য করেছেন। যার সাজা হিসেবে থাকছে ২ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৩ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড।
একই আইনের ২৯ ধারা অনুযায়ী ২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড। জরিমানা অনাদায়ে আইনানুযায়ী কারাদণ্ড।
৩১ ধারা অনুযায়ী এই ব্যক্তির ৫ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।
এইদিকে ১৮৬০ (Penal Code, 1860) এর ১৮৬ ধারা অনুযায়ী ৩ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড, বা অনধিক ৫০০ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হয়।
এই আইনের ৪৪৭ ধারা অনুযায়ী ৩ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড, বা অনধিক ৫০০ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হয়।
৫০৬ ধারা অনুযায়ী ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, বা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড।
সরকারি গোপনীয়তা আইন, ১৯২৩ (Official Secrets Act, 1923) এর ৩ ধারা অনুযায়ী অপরাধের গুরুত্ব ও নথির স্পর্শকাতরতা ভেদে ৩ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
জনস্বার্থে বা সাংবাদিকতার নীতিমালা মেনে যদি কোনো অনিয়ম তুলে ধরা হতো, তবে সাধারণ মানুষ এটিকে সাধুবাদ জানাতো। কিন্তু স্রেফ ভাইরাল হওয়ার সস্তা হিরোইজম দেখাতে গিয়ে পুরো একটি সরকারি দপ্তরের শৃঙ্খলা ভেঙে দেওয়া এবং কর্মচারীদের মানসিকভাবে হেনস্থা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বরুড়ার স্থানীয় সুধী সমাজ ও আইনজীবীরা বলছেন, এই ঘটনার বিচার না হলে সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ভেঙে পড়বে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বরুড়া উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের এক ভুক্তভোগী কর্মচারী জানান, আমরা সাধারণ মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্য নিয়োজিত। কিন্তু কেউ যদি হুট করে ক্যামেরা ধরে অকথ্য ভাষায় কথা বলে ফেসবুকে ভিউ পাওয়ার সস্তা চেষ্টা করে, তবে আমাদের কাজের পরিবেশ ও মানসিকভাবে চরম ক্ষতি হয়। প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি, আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হোক।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের স্বাধীনতা মানেই আইন ভাঙার লাইসেন্স নয়। বরুড়া উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের উচিত, ভাইরাল হওয়ার এই বিপজ্জনক সংস্কৃতি রুখতে ভিডিওর তথ্য ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দণ্ডবিধি এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা মোতাবেক দ্রুত মামলা রুজু করা। একজন অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনলে ভবিষ্যতে সস্তা প্রচারণার উদ্দেশ্যে সরকারি দপ্তরে অনধিকার প্রবেশ ও হেনস্থা করার সাহস আর কেউ পাবে না।



















