কুমিল্লায় কয়েকটি থানা এলাকায় টোকেন বাণিজ্য করছেন তুহিন-বাবুল সিন্ডিকেট, দেখার কেউ নাই!
পিকআপ, মাইক্রোবাসসহ হাজারো যানবাহন জিম্মি; মাসে কোটি টাকার চাঁদাবাজির অভিযোগ, নির্বিকার প্রশাসন
এম এ কাদের অপুঃ
কুমিল্লার বিস্তীর্ণ জনপদ এখন এক অদৃশ্য ‘টোকেন’ চক্রের মুঠোয়। জেলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ থানা এলাকায় মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে অবাধে চলছে টোকেন বাণিজ্য। আর এই পুরো চাঁদাবাজি সাম্রাজ্যের নেপথ্যে রয়েছে ‘তুহিন ও বাবুল সিন্ডিকেট। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে, কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের ‘নীরব সম্মতি’তেই দিনের পর দিন এই চক্রটি সাধারণ চালক ও পরিবহন মালিকদের পকেট কেটে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সর্বত্র বিষয়টি জানাজানি হলেও এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো যেন কেউ নেই!
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুমিল্লা সদরদক্ষিণ, লালমাই, লাকসাম, বরুড়াসহ বেশ কয়েকটি থানা এলাকার সড়কগুলোতে চলাচলকারী পিকআপ ভ্যান, মাইক্রোবাস, লোনা ট্রাক ও হিউম্যান হলারগুলোকে টার্গেট করেছে এই তুহিন ও বাবুল সিন্ডিকেট। তাদের তৈরি বিশেষ এক ধরণের ‘টোকেন’ বা স্লিপ না নিয়ে কোনো গাড়ি এই এলাকাগুলোতে চলতে পারে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পিকআপ চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
তুহিন আর বাবুলের লোক খাড়ায়া থাকে মোড়ে মোড়ে। মাসের শুরুতে টাকা দিয়া টোকেন লন লাগবো। টোকেন কাঁচের ওপর লাগানো থাকলে কোনো পুলিশ ধরে না, আর টোকেন না থাকলে পদে পদে হয়রানি আর মামলার ভয়।
সিন্ডিকেটটির প্রধান আয়ের উৎস পণ্যবাহী পিকআপ এবং ভাড়ায় চালিত মাইক্রোবাস। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশ এবং জেলার অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার পিকআপ ও মাইক্রোবাস চলাচল করে।
গাড়িভেদে প্রতি মাসে এই টোকেনের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২,৫০০ টাকা থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত।
অনেক ক্ষেত্রে দূরপাল্লার বা বহিরাগত গাড়ির ক্ষেত্রে দৈনিক ভিত্তিতেও ‘টোকেন ফি’ আদায় করা হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, টোকেনধারী মাইক্রোবাসগুলো স্ট্যান্ড বা মহাসড়কের পাশে অবৈধভাবে পার্কিং করে রাখলেও কোনো ট্রাফিক পুলিশ বা হাইওয়ে পুলিশ তাদের বাধা দেয় না। অথচ টোকেনহীন কোনো সাধারণ চালক গাড়ি থামালেই তাদের ওপর চড়াও হয় প্রশাসন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই চক্রের প্রধান দুই হোতা তুহিন ও বাবুল দীর্ঘদিন ধরে কুমিল্লার পরিবহন সেক্টর নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। তাদের আন্ডারে কাজ করে শতাধিক লাইনম্যান ও টোল আদায়কারী লাঠিয়াল বাহিনী। এই বাহিনীর সদস্যরা এতটাই বেপরোয়া যে, কোনো চালক চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গাড়ি ভাঙচুর এবং চালককে মারধরের ঘটনাও নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হিসাব কষে দেখা গেছে, এই সিন্ডিকেটের আওতায় প্রতিদিন কয়েক হাজার যানবাহন থেকে টাকা তোলা হয়। মাস শেষে এই টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় কোটি টাকার ওপরে। এই বিপুল পরিমাণ টাকার একটি বড় অংশ চলে যায় সিন্ডিকেটের পকেটে, আর বাকি অংশ যায় বিভিন্ন মহলের ‘ম্যানেজ’ প্রক্রিয়ায়। এমনটাই অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবহন মালিকদের।
কুমিল্লার সচেতন নাগরিক সমাজ ও সাধারণ চালকদের একটাই প্রশ্ন, সবকিছু ওপেন সিক্রেট হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসন কেন নীরব? দিনের আলোতে প্রকাশ্যে টোকেন বিক্রি আর চাঁদাবাজি চললেও ‘তুহিনও বাবুল সিন্ডিকেট’ রয়ে গেছে স্পর্শের বাইরে।
পরিবহন খাতের এই নৈরাজ্য ও চাঁদাবাজির অবসান ঘটাতে এবং তুহিন-বাবুল সিন্ডিকেটের রাহুগ্রাস থেকে সাধারণ চালকদের বাঁচাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন কুমিল্লার সর্বস্তরের মানুষ।


















