এম এ কাদের অপু:
দিন কিংবা রাত, সময়ের কোনো তফাত নেই। কুমিল্লা বিশ্বরোড থেকে নাথেরপেটুয়া পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়কে নিয়ম ভাঙার মহোৎসব।
উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করে বুক ফুলিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শত শত অবৈধ সিএনজি চালিত অটোরিকশা এবং বেপরোয়া মাটিকাটা ট্রাক্টর (কাকড়া)। আর এই পুরো অবৈধ সাম্রাজ্য পরিচালিত হচ্ছে এক সুনির্দিষ্ট মাসিক মাসোয়ারার (চাঁদাবাজি) বিনিময়ে।
অভিযোগের আঙুল খোদ লাকসাম ক্রসিং হাইওয়ে পুলিশের দিকে, যাদের নাকের ডগা দিয়েই প্রতিদিন হাজারো মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছে এই অননুমোদিত যানবাহনগুলো।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের এই রুটে অবৈধ যান চলাচলের পেছনে রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সিএনজি এবং ট্রাক্টর প্রতি নির্দিষ্ট হারে মাসিক চাঁদা বা ‘মাসোয়ারা’ নির্ধারণ করা আছে।
চালকদের একাংশের দাবি, মাসোয়ারার টাকা পরিশোধ করলেই মেলে একটি বিশেষ কোড নম্বর, কখনো মোবাইল নাম্বার, কখনো বিশেষ নাম্বার। এই বিশেষ নাম্বার গাড়ির ড্রাইভারের কাছে থাকলে হাইওয়ে পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট ফাঁড়ির সদস্যরা চোখ বন্ধ করে থাকেন।
এই রুটটিতে চলাচলকারী অধিকাংশ ট্রাক্টর ও সিএনজি চালকের কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদেরও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাতে দেখা যায়।
মাসিক টাকা না দিলে হাইওয়ে পুলিশ ধরে নিয়ে মামলা দেয়, গাড়ি আটকে রাখে। আর মাসিক টাকা সময়মতো পৌঁছালে আর কোনো ভয় থাকে না। মহাসড়কে আমরা বুক ফুলায়া চালাই বলে জানান লাইসেন্স বিহীন ড্রাইভাররা।
নাকের ডগায় অনিয়ম, লালমাই হাইওয়ে পুলিশ নির্বিকার।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে হাইওয়ে পুলিশের টহল দল বা চেকপোস্ট থাকার পরও এসব অবৈধ যান কোনো বাধা ছাড়াই পার হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় পথচারী ও নিয়মিত যাত্রীদের অভিযোগ, পুলিশের দায়িত্ব যেখানে মহাসড়ক নিরাপদ রাখা, সেখানে তারা ব্যস্ত থাকেন ‘মাসোয়ারা’ আদায়ের হিসাব মেলাতে। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে এখন হাইওয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অনুমোদনহীন সিএনজি এবং ভারী ট্রাক্টরের অবাধ চলাচলের কারণে কুমিল্লা-নাথেরপেটুয়া রুটে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। বিশেষ করে রাতে বালু বা মাটি বোঝাই ট্রাক্টরগুলোর কোনো হেডলাইট বা ব্যাকলাইট থাকে না, যার ফলে দূরপাল্লার দ্রুতগামী বাস ও ট্রাকের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা এখন নিত্যদিনের ব্যাপার।
যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং উল্টো পথে চলার কারণে বিশ্বরোডসহ বিভিন্ন মোড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে হাজারো মানুষের কর্মঘণ্টা।
অতিরিক্ত ক্ষমতাসম্পন্ন এবং অবৈধ কাঠামোর ট্রাক্টরগুলোর কারণে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়কটি দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী যাত্রীদের দাবি, অনতিবিলম্বে এই ‘মাসোয়ারা সিন্ডিকেট’ ভাঙতে হবে। মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে এই মরণফাঁদ থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই।
এই বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে, তাদের সেই পিরানো ডায়ালগ, অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং অবৈধ যানের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, এসব মিথ্যা বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বাস্তবের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।
কুমিল্লা বিশ্বরোড থেকে নাথেরপেটুয়া রুটের এই নৈরাজ্য বন্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, মাসোয়ারার লোভে আরও কত প্রাণ মহাসড়কের পিচঢালা রাস্তায় ঝরে পড়বে, তার হিসাব কেউ জানে না।


















