এম এ কাদের অপুঃ
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার শাকপুর ইউনিয়নের রাজপুর গ্রামের একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশের পর দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসাদুজ্জামান রনি। দীর্ঘদিন ধরে ছয় সন্তানের এক বৃদ্ধ বাবা ও তাঁর প্রতিবন্ধী মেয়েকে মানবেতর পরিবেশে বসবাস করার অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সরকারি এই কর্মকর্তা। বৃদ্ধ বাবাকে ছেলেদের পারিবারিক আবাসে ফিরিয়ে দেন এবং সন্তানদের প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা প্রদান করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজপুর গ্রামের ওই বৃদ্ধ ব্যক্তি জীবনের অধিকাংশ সময় সন্তানদের মানুষ করতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু বার্ধক্যে এসে তাঁকে বসবাস করতে হচ্ছিল একটি মুরগির খামারঘরে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী এক মেয়ে। অন্যদিকে তাঁর ছেলেরা নিজ নিজ পরিবার নিয়ে পাকা ভবনে বসবাস করলেও বৃদ্ধ বাবা ও অসহায় মেয়ের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছিলেন না বলে অভিযোগ ওঠে।
বিষয়টি কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে জনসমক্ষে তুলে ধরেন। সংবাদ প্রকাশের পর এলাকাজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। মানবিক এই সংকটের খবর প্রশাসনের নজরে আসতেই বরুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান রনি দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।
ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি বৃদ্ধ বাবার সঙ্গে কথা বলেন, পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য শোনেন এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। পরে তিনি ছেলেদের সঙ্গে আলোচনা করে বৃদ্ধ বাবার নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বাবা-মায়ের ভরণপোষণ ও সেবা-যত্ন করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি আইনগত বাধ্যবাধকতাও।
বরুড়া উপজেলাবাসী আস্থা, উপজেলা নির্বাহী অফিসার আসাদুজ্জামান রনি উপস্থিত পরিবার সদস্যদের সতর্ক করে জানান, ভবিষ্যতে যদি বৃদ্ধ বাবা কিংবা প্রতিবন্ধী মেয়ের প্রতি অবহেলা বা নির্যাতনের কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, সমাজে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি অবহেলার ঘটনা ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। এমন সময়ে প্রশাসনের দৃশ্যমান ও মানবিক পদক্ষেপ অন্যদের জন্যও একটি শক্ত বার্তা বহন করে।
সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক সমাজে পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলে অনেক প্রবীণ ব্যক্তি অবহেলা ও একাকীত্বের শিকার হচ্ছেন। অথচ একজন সন্তানের জীবনে বাবা-মায়ের অবদান অপরিসীম। তাই তাঁদের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করা শুধু পারিবারিক নয়, সামাজিক দায়িত্বও।
গণমাধ্যমকর্মীরা মনে করেন, এই ঘটনার মাধ্যমে সাংবাদিকতার সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্তও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কারণ স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রকাশিত প্রতিবেদনই প্রশাসনের নজর কাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত একজন অসহায় বৃদ্ধ বাবা তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা ফিরে পান।
রাজপুর গ্রামের এই ঘটনা এখন কেবল একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি সমাজের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। বার্ধক্যে বাবা-মাকে অবহেলা নয়, বরং সম্মান ও ভালোবাসার সঙ্গে পাশে দাঁড়ানোই একজন সন্তানের প্রকৃত পরিচয়। আর সেই মানবিক মূল্যবোধ রক্ষায় প্রশাসন ও গণমাধ্যমের যৌথ ভূমিকা যে কতটা কার্যকর হতে পারে, তার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকল বরুড়ার এই ঘটনা।


















