প্রিন্ট এর তারিখঃ এপ্রিল ৫, ২০২৬, ৪:০১ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ এপ্রিল ১, ২০২৬, ৩:৫৪ পূর্বাহ্ণ
কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে জংশন, দেশের পূর্বাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত অন্যতম ব্যস্ত এক জনপদ। প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী, চাঁদপুর, ময়মনসিংহের মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটে চলাচলকারী প্রায় এক হাজারেরও বেশি যাত্রী এই জংশন ব্যবহার করেন। এই বিশাল সংখ্যক যাত্রীর ভরসাস্থল এই রেলওয়ে জংশনটি এখন পরিণত হয়েছে টিকিট কালোবাজারি সিন্ডিকেটের অবাধ বিচরণভূমিতে। রেলওয়ের টিকিট এখন সাধারণ মানুষের জন্য সোনার হরিণ, অথচ কালোবাজারিদের পকেটে মিলে যাচ্ছে টিকিট! এই ভয়াবহ টিকিট কেলেঙ্কারির মূল হোতা হিসেবে জংশন বাজারের চিহ্নিত কাপড় ব্যবসায়ী এনাম-এর নাম বারবার উঠে এলেও, রহস্যজনকভাবে সে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
[caption id="attachment_1937" align="alignleft" width="356"]
টিকেট কালোবাজারি এনাম[/caption]
অনুসন্ধানে জানা গেছে, লাকসাম রেলওয়ে জংশনের পাশে অবস্থিত জংশন বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী এনাম নিজেই গড়ে তুলেছেন একটি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত টিকিট কালোবাজারি সিন্ডিকেট। এই এনাম চক্রটি ট্রেনের টিকিট কাউন্টার থেকে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে এবং কাউন্টারম্যানদের বাড়তি সুযোগ দিয়ে বিপুল সংখ্যক টিকিট সংগ্রহ করে নেয়। এরপর সাধারণ যাত্রীদের কাছে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে তা বিক্রি করে। অসহায় যাত্রীরা, যাদের জরুরি টিকিট প্রয়োজন, তারা বাধ্য হয়ে এই কালোবাজারিদের শরণাপন্ন হন এবং চড়া মূল্য গুনে টিকিট কেনেন। প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে এই চক্র। অভিযোগ রয়েছে, এনামের এই কালো ব্যবসা এতটাই রমরমা যে, এর পেছনে স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তিও জড়িত আছে।
দিনের পর দিন টিকিট না পেয়ে হয়রানির শিকার হতে হতে অবশেষে ফুঁসে উঠেছেন সাধারণ যাত্রীরা। গত চার দিন আগে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন তারা। কাউন্টারের সামনে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়েও যখন তারা জানতে পারেন টিকিট নেই, অথচ বাইরে কালোবাজারিদের হাতে অহরহ টিকিট পাওয়া যাচ্ছে, তখন তাদের ক্ষোভের পারদ চরম আকার ধারণ করে। গত সপ্তাহে বহু যাত্রী একত্রিত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং এই টিকিট কালোবাজারি বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তারা এনামসহ সকল কালোবাজারির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। কিন্তু যাত্রীদের এই আহাজারি ও বিক্ষোভ প্রশাসনের কর্ণগোচর হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ, বিক্ষোভ যে হয়েছে তা জানেইনা লাকসাম রেলওয়ে (জিআরপি) থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)।
যাত্রীদের সবচেয়ে বেশি হতবাক করেছে লাকসাম রেলওয়ে (জিআরপি) থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)-এর বক্তব্য। প্রকাশ্যে দিবালোকে একটি সুসংগঠিত চক্র যখন টিকিট কালোবাজারি করছে, তখন ওসি দাবি করছেন যে, তার স্টেশনে টিকিট কালোবাজারি হয়, এমনটা তিনি জানেন না! এটি নিছকই অজ্ঞতা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। অনেকে মনে করছেন, ওসির এই ‘অজ্ঞাত’ থাকা আসলে কালোবাজারিদের পরোক্ষভাবে সহায়তা করারই নামান্তর।বিক্ষোভের পরেরদিন ওসি তার বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে টিকেট বিক্রি করিয়েছেন বলেন জানান।
পুলিশ সদস্য অথবা রেলওয়ে নিরাপত্তাবাহিনী (আরএনবি) সদস্যদের দিয়ে যদি প্রায় ৪৬টি টিকেট বিক্রি করেই থাকেন যেভাবে তিনি বলেছেন, তাহলে তিনি যে আইন লঙ্ঘন করেছেন তা হলোঃ রেলওয়ে আইন, ১৮৯০ (The Railways Act, 1890), দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (The Penal Code, 1860, ধারা ১৬১, ধারা ১৬৬, ধারা ১৬৭, ধারা ৪০৬, ধারা ৪২০, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ (Anti-Corruption Commission Act, 2004 আইন গুলো তিনি অমান্য করার কারনে তিনি কি বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াবেন নাকি পার পেয়ে যাবেন?
লাকসামের সচেতন মহল, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং ভুক্তভোগী যাত্রীরা অবিলম্বে 'টিকিট সম্রাট' এনামসহ তার পুরো সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসন যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে এই কালোবাজারি আরও বিস্তৃত হবে এবং হাজার হাজার সাধারণ মানুষের হয়রানি বাড়তেই থাকবে। রেলওয়ের মতো একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সেবার এমন করুণ দশা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এখনই সময়, এই অবৈধ চক্রকে নির্মূল করে যাত্রীবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনার।