প্রিন্ট এর তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬, ২:০১ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬, ৪:১১ পূর্বাহ্ণ
আইন, আদালত এবং প্রশাসনিক নজরদারিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এক নির্মম নাটকের জন্ম দিয়েছে চাঁদপুরের শাহরাস্তি থানা পুলিশ ও স্থানীয় একটি প্রতারক চক্র।
চাঁদপুরের বিজ্ঞ আদালতের সুস্পষ্ট সার্চ ওয়ারেন্ট থাকার পরও ৭ বছরের অবুঝ শিশু সাবিনা সালমানকে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে না দিয়ে উল্টা ২০ হাজারেরও বেশি টাকা খেয়ে নিলেন শাহরাস্তি থানার এসআই আল আমিন।বর্তমানে বদলি হয়ে গেলেন অথচ, বদলি আদেশ হওয়ার পর তার দায়িত্বে থাকা সমস্ত কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন শাহরাস্তি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)কে।
এসআই আল আমিনের দায়িত্বে থাকা এই চার্চ ওয়ারেন্টটি বুঝে পাওয়ার পরেও কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে এখনো নজরে আসেনি।
পুলিশের এই দায়িত্বহীনতা, ঘুষ বাণিজ্য এবং রহস্যজনক নীরবতার সুযোগ নিয়ে প্রধান অভিযুক্ত সালিশদার মিজান মুহুরীর মাধ্যমে শিশুটিকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে এবং প্রবাসে পাচারের নির্মম সত্য জেনে বর্তমানে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন অসহায় মা জাহেদা আক্তার।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভুক্তভোগী জাহেদা আক্তারের সাথে তার স্বামী সালমানের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। এরপর গ্রামের স্থানীয় প্রভাবশালী ও সালিশদার মিজান মুহুরী বাদিনীর পাওনা মোহরানা বুঝিয়ে দেন এবং একজন কাজীকে এনে তালাক পড়ান। তালাক পড়িয়ে ১০০ টাকার ৩ টা ষ্ট্যাম্পে স্বাক্ষর রেখে দেয় এই মুহুরী।
সেই সালিশে অত্যন্ত সুকৌশলে ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় এক দিনের জন্য মেয়েকে তার বাবার বাড়ি নিয়ে যাওয়ার মিথ্যা প্রলোভন দেখানো হয়।যদিও মেয়েটির বাবা থাকে প্রবাসে আর বাড়িতে আছে তার বাবার অপর স্ত্রী অর্থাৎ সৎ মা! যেহেতু মিজান পেশায় একজন মুহুরী, তাই আইনি মারপ্যাঁচ ও চতুর ভাষা ব্যবহার করে তিনি এমন সব শর্ত ও লেখা সেখানে যুক্ত করেন যা উপস্থিত সাধারণ মানুষের বোঝার সাধ্যের বাইরে ছিল। পরবর্তীতে অন্য একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীকে দিয়ে স্ট্যাম্পগুলো পড়ানোর পর জাহেদা আক্তার বুঝতে পারেন যে তিনি এক গভীর প্রতারণার শিকার হয়েছেন এবং তার একমাত্র কলিজার টুকরা সন্তানকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
নিজের বুকফাটা আর্তনাদ আর সন্তান হারানোর যন্ত্রণায় বাধ্য হয়ে জাহেদা আক্তার চাঁদপুর বিজ্ঞ আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলার গুরুত্ব অনুধাবন করে ৭ বছরের শিশু নাবিলা সালমানকে দ্রুত উদ্ধার করে মায়ের জিম্মায় বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য শাহরাস্তি থানাকে নির্দেশ দিয়ে সার্চ ওয়ারেন্ট জারি করেন।
কিন্তু আদালতের এই নির্দেশ হাতে পেয়েই যেন মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে আসে শাহরাস্তি থানার এসআই আল আমিন। অভিযোগ রয়েছে, আদালতের পরোয়ানা তামিল করার কথা বলে এসআই আল আমিন বাদিনী জাহেদার কাছ থেকে দফায় দফায় ২০ হাজারেরও বেশি টাকা হাতিয়ে নেন। টাকা নেওয়ার পর নামমাত্র একবার শিশুটিকে উদ্ধারের নাটক করতে গেলেও পরবর্তীতে তিনি আর কোনো পদক্ষেপ নেননি। বরং পুলিশের দায়িত্ব পালন তো দূরের কথা, উল্টো বাদিনী জাহেদা আক্তারকে নানা ধরনের অকথ্য গালিগালাজ, হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন।
মামলা করেছেন অসহায় মা জাহেদা কিন্তু চার্চ ওয়ারেন্টের একটা ফটোকপিও দেয়নি এই আল আমিন। পরে ২ দিন চেষ্টা করার পর, শাহরাস্তি থানার ওসির সাথে তার ব্যবহারিত নাম্বারে কল দিয়ে বিস্তারিত সব কিছু বলার পর তিনি অন্তত একটা ছবি তুলে দিবেন বলেও জানালেন কিন্তু সারারাত অপেক্ষার পরেও তিনি তা দিলেন না। নিরুপায় হয়ে ঘটনা জানানো হয় শাহরাস্তি থানার সার্কেল কে। তিনিও ওসি সাহেবের সাথে কথা বলবেন বলে জানালেও পরে আর কোনো কিছুই অবগত করতে পারলেন না। পুলিশ কর্মকর্তাদের এমন পেশাগত অবহেলার বিরুদ্ধে প্রতিকার পেতে দিশেহারা মা নিজে সাহস পাচ্ছিলেন না তাই সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীর সহযোগিতা চান শাহরাস্তি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং সংশ্লিষ্ট সার্কেল এসপির শরণাপন্ন হওয়ার জন্য। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশার বিষয় হলো, শাহরাস্তি থানার ওসি কিংবা সার্কেল এসপি কেউই এই গুরুতর বিষয়টি আমলে নেননি। তারা কোনো ধরনের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি এবং শিশুটিকে উদ্ধারে ন্যূনতম সহযোগিতাও করেননি। পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলের এই রহস্যজনক নীরবতা ও উদাসীনতা অপরাধী চক্রকে আরও বেশি বেপরোয়া করে তোলে।
প্রশাসনের ছত্রছায়ায় বিদেশে পাচার ও মায়ের মরনাপন্ন অবস্থা
পুলিশের দীর্ঘসূত্রিতা, ঘুষ বাণিজ্য এবং নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে প্রতারক চক্রের মূল হোতা মিজান মুহুরী এক জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করেন। তিনি পুলিশকে মোটা অংকের বিনিময়ে থামিয়ে দিয়ে ও প্রভাবশালী মহলের সুরক্ষায়, সেই সাথে ৪৫০০ টাকা দিয়ে শিশুর টিকার কার্ডের সাথে আরেকটি নাম যুক্ত করে, জন্মনিবন্ধন বানিয়ে ৭ বছরের অবুঝ শিশু সাবিনা সালমানকে দেশ থেকে বিদেশে পাচার বা পাঠিয়ে দেন।
আইনের আশ্রয় নিয়ে সন্তান ফিরে পাওয়ার শেষ আশাটুকুও যখন ধূলিসাৎ হয়ে গেল এবং নিজের একমাত্র শিশু কন্যা দেশান্তরী হওয়ার খবর পেলেন, তখন থেকেই মা জাহেদা আক্তার মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েন। বর্তমানে তিনি বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন, তার অবস্থা এখন প্রায় মরনাপন্ন। তার সাথে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনার পিছনে মিজান মুহুরী নামক ব্যক্তি, জহির মিয়াজী এবং শাহরাস্তি থানার ওসি এবং এসআই আল আমিনকে দায়ী করে একটি চিরকুট লিখে রাখেন। তার যদি কোনো ধরনের কিছু হয়ে যায়, তার জন্য এই ৪ জন ব্যক্তি দায়ী বলে চিরকুটে স্পষ্ট লেখা রয়েছে।
আইন যেখানে সবার সমান আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা, সেখানে রক্ষক যখন ভক্ষক হয়, তখন সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয় কোথায় গিয়ে ঠেকে, সাবিনা ও তার মায়ের এই মর্মান্তিক পরিণতি তারই এক নিষ্ঠুর প্রমাণ।
সমাজের বিবেকবান মানুষ গুলো আজ কোথায়? শিশুর মা জাহেদা আক্তার শেষ আশ্রয় হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশের সর্বোচ্চ ব্যক্তির কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন যেনো, এসআই আল আমিন, সালিশদার মিজান মুহুরী এবং শাহরাস্তি থানার ওসি সহ উদাসীন পুলিশ কর্মকর্তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানাবেন।